দূরে নির্জনে মৌসুনি দ্বীপ

দূরে নির্জনে মৌসুনি দ্বীপ

অফিসের একঘেয়েমি রোজনামচা থেকে কিছু দিন ছুটির প্রয়োজন ছিল | তাই সপ্তাহান্তে ছুটি কাটানোর জন্যে দীঘা, মন্দারমণি, শঙ্করপুর এর বেড়াজাল পেরিয়ে খোঁজ করতে লাগলাম নতুন জায়গার | মৌসুনি দ্বীপ এর নাম শুনে সেখানে যাওয়ার এবং থাকার তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু করলাম | ছবি এবং YouTube এর কিছু ভিডিও দেখে যা বুঝলাম, সমুদ্র এর শান্ত গাম্ভীর্যকে উপভোগ করতে এর থেকে ভালো জায়গা আর নেই | পৌঁছানোর পর বুঝলাম, শহরের ব্যস্ততা আর কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে নির্জনে দুটোদিন নিখাদ বিশ্রাম এর জায়গা হিসেবে মৌসুনির কোনো তুলনা হয়না |

Mousuni Island
Mousuni Island
Mousuni Island

যেমন ভাবা তেমন কাজ | সঙ্গী হিসাবে পেয়ে গেলাম আমার দুই শালা এবং এক জামাইবাবু | থাকার জায়গার খোঁজ নিয়ে দেখলাম বেশ কিছু সংস্থা সেখানে ক্যাম্প এ থাকার ব্যবস্থা করেছে | ক্যাম্প ছাড়াও রয়েছে “Mud House” বা মাটির বাড়ি এবং দর্মা আর খড়ের ছাউনি দিয়ে তৈরী কটেজ | আমার অফিস এর এক সহকর্মী বন্ধু কে ব্যাপারটা বলতে, সে জানালো কয়েকদিন আগে সেইরকম ই একটা ক্যাম্প এ সে থেকে এসেছে এবং সেটার ব্যবস্থাপক তারই ভাই | ব্যাস, তার ভাই এর সাথে কথা বলে বুক করে ফেললাম Alafiia, Traveller’s Camp (www.alafiia.com) | ৭ এবং ৮ সেপেটম্বের এর জন্যে অনলাইন পেমেন্ট করে বুক করলাম দুটো কটেজ | সাথে সাথে ফোনে পেয়ে গেলাম বুকিং কনফার্মেশন মেসেজ এবং ক্যাম্প ম্যানেজার এর কন্টাক্ট নম্বর |
এখানে ৩ রকম এর থাকার জায়গা পাওয়া যাবে |
Adventure Dome Tent: ₹1050/- each person per day
4 Persons in a Family Tent: ₹1150/- each person per day
2-3 Persons in a Cottage House: ₹1250/- each person per day
উপরোক্ত সব রেন্ট গুলো থাকা এন্ড খাওয়া নিয়ে (ওয়েলকাম ড্রিংক, লাঞ্চ, ডিনার, ব্রেকফাস্ট) |
৭ তারিখ সকালে শিয়ালদহ থেকে ৫:১২ এর নামখানা লোকাল এ চেপে পড়লাম | ট্রেনটি পথে সব স্টেশন এই দাঁড়ালো কিন্তু লক্ষ্মীকান্তপুর এ নিলো প্রায় ২০ মিনিট এর হল্ট | শেষমেশ ৮:০৫ এ নামলাম নামখানা স্টেশন এ | স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটা টোটোর সাথে দরদাম করে ২৫০ টাকা এ পৌঁছে গেলাম হুজ্জাত এর ঘাট | সময় নিলো প্রায় ৪০ মিনিট | পেরোলাম নতুন তৈরি হওয়া হাতানিয়া দোয়ানিয়া ব্রিজ | মাঝে একজায়গায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে মুড়ি, ঘুগনি আর ডিম্ এর ওমলেট দিয়ে সেরে নিলাম সকাল এর জলখাবার | এখানে বলে রাখি, সরাসরি টোটো ছাড়াও হুজ্জাত এর ঘাট যাওয়ার আরো সাশ্রয়ী উপায়ও আছে | স্টেশন থেকে ২-৩ মিনিট হেঁটে গেলে ই পাবেন বাস স্ট্যান্ড | সেখান থেকে বকখালি যাওয়ার বাসে উঠে “সাত মাইল” নামতে হবে | ভাড়া জনপ্রতি ১২ টাকা | ওখান থেকে ভ্যানে করে হুজ্জাত এর ঘাট | ভাড়া জনপ্রতি ৮ টাকা | হুজ্জাত এর ঘাট থেকে ৩ টাকা ভাড়া দিয়ে চিনাই নদী পেরোলাম | সেখান থেকে টোটো করে পৌঁছে গেলাম Alafiia, Traveller’s Camp | ভাড়া জনপ্রতি ৩০ টাকা এবং সময় নিলো ৩০ মিনিট |
কটেজে ব্যাগ রেখে বেরিয়ে পড়লাম সীমাহীন সমুদ্র এর সাথে প্রথম আলাপ সেরে নিতে | ক্যাম্প এর একটি ছেলে সেখানে নিয়ে এলো সদ্য পেড়ে আনা ডাব এর জল | সেই জল পান করে গলা এবং ঢেউ এর সাথে ভেসে আসা স্নিগ্ধ বাতাস মেখে মন, দুইই জুড়িয়ে গেলো | ফিরে এসে পরিচয় হলো ক্যাম্প ম্যানেজার নিত্যানন্দ দাদা র সাথে | ঘুরিয়ে দেখালেন ক্যাম্প চত্বর | দেখলাম একটি ছোট এবং একটি ফ্যামিলি টেন্ট বসানো হচ্ছে আগত কিছু অতিথির জন্যে |
এরপর গেলাম সমুদ্র স্নানে | স্নানের সাথে চললো স্থানীয় কচিকাঁচাদের সাথে ফুটবল খেলা | খেলা এবং স্নানের শেষে সেরে নিলাম মধ্যাহ্নভোজন | আয়োজন ছিল ভাত, ডাল, বেগু ভাজা, আলু পটল এর তরকারি, পোনা মাছের ঝাল, চাটনি এবং পাঁপড় | আমরা আগেই ফোনে বলে রেখেছিলাম সাথে ভেটকি মাছ খাবো | সেইমতো ক্যাম্প এর পেছনে মাছ এর আড়ৎ থেকে এনে রাখা মাছ ভাত এর সাথে গরম গরম ভেজে দিলো | অতুলনীয় তার স্বাদ | খাওয়া শেষে কটেজ গেলাম বাঙালীর চিরাচরিত দিবানিদ্রা সম্পন্ন করতে | আসলে সেই ভোরে ওঠা এবং তারপর এতটা পথ এসে একটু জিরিয়ে নেওয়াই যায় | কি বলুন ?
ঘুম ভাঙলো পড়ন্ত বিকেলে পাখিদের ঘরে ফেরার ডাকে | কটেজ থেকে বেরিয়ে বুঝলাম কখন এক পশলা বৃষ্টি হয়ে আকাশ আবার তার চিরাচরিত স্নিগ্ধ নীল চাদরে নিজেকে ঢেকে নিয়েছে | বেলাভূমিতে সূর্যাস্ত দেখে ফিরে এলাম চা এর টানে | চা এর সাথে ছিল মুড়ি আর সব্জি পাকোড়া | চা পর্ব শেষ করে আবার ফিরে গেলাম বেলাভূমিতে | ততক্ষন এ হওয়ার গতিবেগ কয়েকগুন বেড়ে গেছে | যত রাত বেড়েছে হওয়ার বেগ ও বেড়েছে পাল্লা দিয়ে | ডিনার এর পর যত রাত অবধি আমরা সমুদ্র প্রান্তরে ছিলাম, এই হওয়ার বেগ ছিল অবিরাম | চা মুড়ির পর একটু হেঁটে ফিরে আসার পর দেখলাম ক্যাম্প ফায়ার এর ব্যবস্থা হচ্ছে | ইঁট দিয়ে চারকোনা খোপ করে তার মধ্যে কাঠ সাজিয়ে রাখা হয়েছে | পাশে টেবিলে রাখা মশলা মাখানো চিকেন | আয়োজন হচ্ছে বার্বেকেউ চিকেন এর | আমাদের অর্ডার মতো ১ কিলো চিকেন এনে ম্যারিনেট করে রেখেছে | এই ব্যাপারটা কিন্তু থাকা এবং খাওয়ার প্যাকেজ এর বাইরে | রান্নার খরচ নিয়ে কেজি প্রতি ৩৫০ টাকা | ক্যাম্প ফায়ার আর বার্বেকেউ চিকেন এর সাথে সন্ধেটা এক কথায় অপূর্ব কাটলো | রাত ১১ টার সময় ডিনার সারলাম রুটি, আলুভাজা আর চিকেন করি দিয়ে | চাইলে ভাত ও পাওয়া যাবে | ডিনার এর পর আরো কিছুক্ষন হাঁটাহাঁটি করে কটেজে এসে ঘুমিয়ে পড়লাম |
পরদিন পরিকল্পনা ছিল খুব ভোরে উঠে যাবো কিছু ভালো ছবি তুলতে | কিন্তু বরুণদেব এর অশেষ কৃপায় সকাল ৭ টার আগে সেটা আর সম্ভব হলো না | ১০:৩০ এ বেরোতে হবে তাই একটু চা সেবা করে বেরিয়ে পড়লাম আরো একবার বেলাভূমিতে ফুসফুসের অক্সিজেন এর সিলিন্ডারটা ভরে নিতে | মাঝে একবার এসে লুচি, তরকারি আর ডিম্ সেদ্ধ সহযোগে সেরে নিলাম সকালের জলখাবার | ফিরে এসে স্নান করে মৌসুনি আর Alafiia Traveller’s Camp কে বিদায় জানিয়ে ফিরে চললাম বাড়ির পথে | নামখানা স্টেশন থেকে ১:৩০ এর লোকাল ধরে ফিরে এলাম কলকাতার জনসমূদ্রে | পেছনে পরে রইলো মৌসুনির হাতছানি | অজান্তেই পেছন ফিরে তাকিয়ে মন বলে উঠলো “আবার হবে তো দেখা, এ দেখাই শেষ দেখা নয়তো” |
বি.দ্র. লেখার ভুল ত্রূটি মার্জনীয় |

Mousuni Island
Mousuni Island
Mousuni Island
Mousuni Island
Mousuni Island

Call Now Button
WhatsApp WhatsApp us